“দিদি, আপনি এখানে?”
বাস থেকে নেমে পড়ে হঠাৎ প্রণাম করে মেয়েটি।
“আরে, তুমি ... হ্যাঁ, এইচ, এস্, কোন ব্যাচ যেন?”
মনে মনে নামটা হাতড়াতে থাকি ...
“কী করছো এখন, বল”।
“দিদি আমি সোমা – ইতিহাসে এম, এ, করছি।
আপনার ইংলিশ কবিতার ক্লাস খুব মিস করি।”
“তাই বুঝি?”
“দ্য লিস্নারস্ পড়ানোর সময় কী অদ্ভূত একটা পরিবেশ তৈরী করতেন আপনি। আপনার সব কটা ক্লাস
আমাদের মনে দাগ কাটত ...
কখনও ভুলতে পারব না।”
অবাক আমি, স্পেলবাউন্ড!
হঠাৎ করে এতো পাওয়া
এতো এক দারুণ উপহার
ছাত্রীর দেওয়া।
পড়াশুনোয় দারুণ রেজাল্ট করা মেয়ে ছিল না সোমা
কিন্তু তার উজ্জ্বল চোখ আর বুদ্ধিদীপ্ত ঝলমলে
মুখখানি ছিল আমার মনের আয়নায়।
আজ টের পেলাম, তার অনুভবের গভীরতা ও তীক্ষ্ণতা –
আমার নিজেকে উজাড় করে দিয়ে পড়ানো
ওর মনে স্থান পেয়েছে চিরস্থায়ী ভাবে।
ঠিক করলাম আজ এই সুন্দর উপহারটা
সাজিয়ে রাখব উপরের তাকে।
সেই ছাত্রী আজ আমার সহকর্মী
ইতিহাসের দিদিমনি
আরো কাছে এসেছে, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সঙ্গে
এখন মিশেছে বন্ধুত্ব।
জন্মগত মাতৃত্ববোধে আরো আপন
হয়ে উঠেছে সে আমার কাছে।
চেষ্টা না করেও হয়ে উঠি
ওর সুখ দুঃখের অংশীদার
ভাবি সেই ছোট্ট মেয়েটির সংসার জীবনের নানান সমস্যায়
যদি যেতে পারি ওর মায়ের জায়গায়।
কষ্ট পাওয়া কোন একদিনের ঘটনায় সোমা
জড়িয়ে ধরে বলেছিল –
দিদি, আপনাকে দেখি মায়ের মতো।
এই পুরস্কারটাও সোমা আমাকে দিল,
সাজিয়ে রেখেছি বুকের উপরের তাকে।
সেদিন আমি স্কুলে যাইনি,
বড় বেদনা আহত মন;
গভীর গোপন ব্যাথা, নীল হয়ে যাওয়া ক্ষত
ফোন বেজে উঠল –
“দিদি আমি সোমা বলছি –
আপনি আজ কেন আসেননি, আমি জানি –
দিদি আপনি কষ্ট পাবেন না –
নিজেকে একদম একা ভাববেন না।
... হ্যালো ... হ্যালো ... ?”
“হ্যাঁ, সোমা, শুনছি –”
“দিদি আপনাকে কষ্ট পেতে দেখতে চাইনা আমরা
আপনার আন্তরিক ভালবাসা আর শিক্ষায়
বড় হয়ে ওঠা আপনার ছাত্রীরা।
দিদি, আপনি তো সফলতম স্ত্রী ছিলেন ...
তবে কেন কষ্ট পাচ্ছেন আজকের দিনে?”
ঝরঝর করে কথা বলে যায় সোমা।
“দিদি, আপনি আজ সফলতম মা।
আপনার ছেলেরা ...
হ্যালো, দিদি, শুনতে পাচ্ছেন ...
আজ বলছি,
আপনি সফলতম শিক্ষিকাও।
আপনার অনুপ্রেরণার ভঙ্গী, ছাত্রীদের ভালোবাসা,
ছোট্ট মনগুলোকে আঘাত না ক’রে বকা
আর প্রাণ ভ’রে পড়ানো
আপনাকে সফলতম শিক্ষিকা করেছে।"
কী বলছিস সোমা?
তুই সেই বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল চোখের
ছোট্ট সাধারণ মেয়েটি?
এতো তোর অনুভবী মন,
এতো গভীরতা?
তুই আজ আর আমার কেয়ে নোস,
তুই আজ আমার মা,
মুছিয়ে দিয়েছিস চোখের জল
আর যতো যাতনা।
উপহার নয় রে সোমা
তুই আমাকে অস্কার বা
নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছিস।
কোথায় রাখব তোর দেওয়া
এই তিনটি সোনার মেডেল?
মেডেলে সোনা থাকে, কিন্তু
থাকে কি এমন বুকচেরা ভালবাসা?
তাই তো এ আমার কাছে
সবচেয়ে সেরা পুরস্কার।
আর সব উপহার, পুরস্কারের পাশে
সাজিয়ে রাখব, সোমা,
তোমার দেওয়া তিনটি স্বর্ণকমল
আমার বুকের তাকে;
চিরকাল যা থাকবে ঝলমলে উজ্জ্বল
আর আমার মনকে করে রাখবে
ভোরের ঝকঝকে সকাল।
২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০